খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই জানুয়ারি ২০১৫, ১:৩২ পিএম
আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় পটুয়াখালী জেলার অভ্যুদয়। পটুয়াখালী জেলা বাংলাদেশের ৮টি বিভাগের মধ্যে বরিশাল বিভাগের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় জেলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কৌশলগত অবস্থান ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে পটুয়াখালী দক্ষিণাঞ্চলের ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

পটুয়াখালী অঞ্চলের ইতিহাস মূলত ব্রিটিশ শাসনামলের প্রশাসনিক বিস্তারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবন কেটে নতুন বসতি স্থাপনের প্রবণতা বাড়তে থাকে। এর ফলে প্রশাসনিক কাঠামো সম্প্রসারণের প্রয়োজন দেখা দেয়।
১৮০৭ সালে বরিশালের জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মিঃ বেটি (Mr. Beatty)। তাঁর শাসনামলেই দক্ষিণাঞ্চলের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। বসতি বৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে ১৮১২ সালে পটুয়াখালী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে মির্জাগঞ্জ থানা গঠন করা হয়। এটিই পটুয়াখালী অঞ্চলের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনের প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত।

পরবর্তীতে দেওয়ানি শাসন সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে ১৮১৭ সালে বরিশালে চারটি মুন্সেফী চৌকি স্থাপন করা হয়। এগুলো হলো—
এর মধ্যে বাউফল চৌকির প্রথম মুন্সেফ ছিলেন ব্রজমোহন দত্ত, যিনি পটুয়াখালীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
১৮৬০ সালের ১ জুন বাউফল থেকে মুন্সেফী চৌকি স্থানান্তর করে লাউকাঠীতে স্থাপন করা হয়। ব্রজমোহন দত্ত এখানেও মুন্সেফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় লাউকাঠীর দক্ষিণ পাড় ছিল গভীর অরণ্যে আবৃত।
লাউকাঠীর দক্ষিণ পাড়ের অরণ্যে একসময় একদল কাপালিক সম্প্রদায় এসে বসতি স্থাপন করে। তারা সেখানে বিগ্রহ স্থাপন করে একটি কালিমন্দির প্রতিষ্ঠা করে। লোকমুখে এই মন্দির পরিচিতি পায় “ডাকাতিয়া কালিবাড়ি” নামে, কারণ জনশ্রুতি অনুযায়ী ওই এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটত। এই কালিবাড়িকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
ব্রজমোহন দত্ত পটুয়াখালীকে একটি পৃথক মহকুমা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। তাঁর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৬৭ সালের ২৭ মার্চ কলকাতা গেজেটে পটুয়াখালী মহকুমা সৃষ্টির ঘোষণা প্রকাশিত হয়। বাস্তবে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয় ১৮৭১ সালে, যখন পটুয়াখালী আনুষ্ঠানিকভাবে একটি মহকুমায় রূপান্তরিত হয়।
লাউকাঠীর দক্ষিণ পাড়ের নামকরণ করা হয় কালিকাপুর, যা জমিদার হৃদয় শংকরের পুত্র কালিকা প্রসাদ রায়ের নামানুসারে রাখা হয়। এই কালিকাপুর এলাকাতেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পটুয়াখালী শহর। মহকুমা সদর দপ্তর স্থাপিত হয় কালিবাড়ি পুকুরের পূর্ব পাড়ে।
প্রথমদিকে বাঁশ ও ছনের তৈরি ঘরে আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এ কারণে স্থানীয় লোকজন একে বলত “বাউশশা কোর্ট”। সে সময় ব্রজমোহন দত্ত একই সঙ্গে মুন্সেফ ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নবগঠিত মহকুমার নামকরণ করা হয় পটুয়াখালী। দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দী মহকুমা হিসেবে পরিচালিত হওয়ার পর পটুয়াখালীর ইতিহাসে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
১৯৬৯ সালের ১ জানুয়ারি পটুয়াখালীকে একটি পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত করা হয়। ওই দিন খুলনা বিভাগের তৎকালীন কমিশনার এ. এম. এফ. পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের ভবনের দরবার হলে জেলা প্রশাসনের কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
এরপর ১৯৬৯ সালের ৯ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল এস. এম. আহসান আনুষ্ঠানিকভাবে পটুয়াখালী জেলার উদ্বোধন করেন। পটুয়াখালীর প্রথম জেলা প্রশাসক ছিলেন হাবিবুল ইসলাম।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পূর্বে এবং স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও বৃহত্তর বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা খুলনা বিভাগের অন্তর্গত ছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠি—এই ছয়টি জেলা নিয়ে বাংলাদেশের পঞ্চম বিভাগ ‘বরিশাল বিভাগ’ গঠিত হয়।

পটুয়াখালী জেলার অভ্যুদয় শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তনের ইতিহাস নয়, বরং এটি দক্ষিণাঞ্চলের জনবসতি, অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার বিকাশের একটি ধারাবাহিক প্রতিফলন। মুন্সেফী চৌকি থেকে মহকুমা এবং মহকুমা থেকে জেলা—এই দীর্ঘ পথচলা পটুয়াখালীকে আজ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় জেলায় পরিণত করেছে।
মন্তব্য